ধর্মীয় মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদ এক ভয়াবহ বিপদ হিসেবে উপস্থিত হয়েছে।

ধর্মীয় মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদ এক ভয়াবহ বিপদ হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। তবে আমি মনে করি, একে মোকাবিলা করা ও পরাস্ত করা কঠিন কিছু নয়। কারণ, বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধর্মীয় মৌলবাদের অনুকূলে নয়। ধর্মীয় মৌলবাদের, বিশেষ করে ইসলামি মৌলবাদের একটা আন্তর্জাতিক চরিত্র আছে। ইসলামি মৌলবাদের উৎস হচ্ছে আরব জগৎ ও মধ্যপ্রাচ্য।

মুক্তচিন্তা, ধর্মীয় সমালোচনা ও স্বাধীন মত প্রকাশ সম্পর্কে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির অসংখ্য সুস্পষ্ট প্রমাণ উল্লেখ করা যায়। পুলিসের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা মুক্তচিন্তার লেখকদের কঠোরভাষায় হুমকি দিয়ে সাবধান করে বলেন- “আমরা যেন সীমা লঙ্ঘন না করি। এমন কিছু লেখা উচিত নয়, যেখানে কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে, বিশ্বাসে আঘাত আনে।” এ বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন- ” কোনও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে কেউ বক্তব্য দিলে তা সহ্য করা হবে না।”

মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায় অনলাইন মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে ‘মুক্তমনা ব্লগ’ এর মাধ্যমে সমগ্র বাঙালি কমিউনিটিতে ধর্ম নিরপেক্ষতা, বিজ্ঞান চর্চা, সমাজবিজ্ঞানের চর্চার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, অনলাইনে বাঙালিদের মুক্তচিন্তার রেনেসাঁর সূচনা অভিজিৎ-এর মুক্তমনার হাত ধরেই। মুক্তবুদ্ধিচর্চার ক্ষেত্রে ‘মুক্তমনা’ ব্লগ একটা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এই ধারার অসংখ্য মানুষ এখন ব্লগ কিংবা ফেসবুককে অবলম্বন করে লেখালেখির মাধ্যমে মুক্তচিন্তা চর্চা করে যাচ্ছেন যা তরুণ প্রজন্মের ভিতর ব্যাপক যোগাযোগ ও প্রভাব বিস্তার করেছে। এই প্রভাবের কেন্দ্রস্থল হল ‘মুক্তমনা’ ব্লগ। স্বাভাবিকভাবেই সবার জানা যে, এই ব্লগের প্রাণপুরুষ ছিলেন অভিজিৎ রায়। আর মুক্তচিন্তার এই যাত্রাকে পথরোধ করা বা আটকে দেয়ার জন্য ইসলামি মৌলবাদী গোষ্ঠী, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল, ক্ষমতার বাইরে থাকা বিরোধী দল থেকে শুরু করে সমাজের স্বার্থান্বেষী সকল মহলই কম-বেশি জড়িত। এটা পরিষ্কার যে, ইসলামি জঙ্গিদের প্রধান টার্গেট ছিল অভিজিৎ রায় এবং সেই সাথে তাঁকে ও ‘মুক্তমনা’ ব্লগ কেন্দ্রিক গড়ে উঠা একদল প্রতিশ্রুতিশীল ও সম্ভাবনাময় লেখক। এখন দেখা যাচ্ছে, শুধু লেখক-ব্লগার কিংবা তাঁর ঘনিষ্ঠজনই নয়, তারা এখন অভিজিৎ-এর প্রকাশকদেরও হত্যার টার্গেট করেছে। অর্থাৎ এই গোষ্ঠীর কাছে অভিজিৎ-ই প্রধান টার্গেট ছিল। অভিজিৎ-এর কোনও ভিত্তি বা নাম-নিশানা তারা বাংলাদেশে রাখতে চায় না। অভিজিৎ যে লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে গিয়েছিলেন, সে লক্ষ্যকে তারা পুরোপুরি ধ্বংস করতে চায় বলেই এখনো হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে।



বাংলাদেশে বহু আগে থেকেই নাস্তিকতা চর্চা ছিল, কিন্তু তখন এই অপরাধে নাস্তিকদের খুন করার ট্রেন্ড ছিল না। এই ট্রেন্ড চালু হয়েছে বিশ্বব্যাপী ইসলামি জঙ্গিবাদের উত্থানের পর থেকেই। ১৯৭৪ সালে দাউদ হায়দারকে কবিতার জন্যে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এরপর ১৯৯১-১৯৯২ সালে বাংলা একাডেমি বই মেলায় লেখক তসলিমা নাসরিনের বই উঠিয়ে নেওয়া হয়, বাংলা একাডেমি বইমেলায় তাঁর প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিল। এমনকী সেসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত্ও করা হয় এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার ‘অপরাধে’ তাঁর বিরুদ্ধে ব্লাসফেমি ও ফাঁসির দাবি তোলে ইসলামি রাজনৈতিক দলসমূহ। তাঁর ফাঁসির দাবিতে সমগ্র দেশে অসংখ্য মামলা রুজু হয়, সরকারও তাঁর বিচারেরও চেষ্টা করে। কিন্তু তিনি গোপনে দেশত্যাগ করায় সরকারি মামলা-মোকদ্দমা, ঝামেলা থেকে রক্ষা পেয়ে প্রাণে বেঁচে যান। এরপর নাস্তিক ও মুরতাদ ঘোষণা দিয়ে সমগ্র দেশে ড. আহমদ শরীফের ফাঁসি দাবি করে আন্দোলন গড়ে তোলে ইসলামি রাজনৈতিক দল। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারিতে ইসলামী জঙ্গি সংগঠন হরকাত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামি মুক্তমনা কবি শামসুর রাহমানকে হত্যার চেষ্টা চালালেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান। এর কয়েকবছর পরে ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বাংলা একাডেমি বই মেলায় অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদের ওপরে নৃশংসভাবে হামলা চালানো হয়। এই হামলা ও আক্রমণের ফলে অল্প কিছুদিন পরই তাঁর মৃত্যু হয়। বাংলাদেশের সরকার এখনো পর্যন্ত ড. আজাদ হত্যাকাণ্ডের যথাযথ তদন্ত ও বিচার করেন নি। এরপর থেকেই মূলত বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার লেখকদের ওপর হামলার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। যা রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসন ও রাজনীতিকদের প্রচ্ছন্ন সহায়তা কিংবা নীরবতার কারণেই ক্রমশ বিশাল আকার ধারণ করেছে।

বস্তুত ইসলামি জঙ্গি বা জিহাদিদের পরিকল্পনায় ব্লগারদের ওপর সাম্প্রতিক হত্যা ও হামলা, একইসঙ্গে সরকার ও রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা এবং এমনকী এদের প্রতি প্রশ্রয়মূলক আচরণ, ব্লগার-লেখকদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার-নির্যাতনের হুমকি ও হয়রানিমূলক ভূমিকা সরকার ও রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের যে অবিশ্বাস, সন্দেহ ও অনাস্থার জন্ম দিয়েছে তার কারণে ইতোমধ্যেই অনেক মুক্তচিন্তার ব্লগার-লেখক বাংলাদেশ ত্যাগ করে বিভিন্ন দেশে চলে গেছেন। কেউ কেউ পার্শ্ববর্তী দেশে সাময়িকভাবে আশ্রয় নিয়েছেন; এবং এখনো অনেকে দেশ ছেড়ে চলে যাবার চেষ্টা করছেন। এখানে একটা বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এসকল ব্লগার-লেখকরা নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে চাকুরী বা উন্নত জীবন কিংবা স্রেফ জীবিকার সন্ধানে পাশ্চাত্যে যাবার সিদ্ধান্ত নেন নি। তাঁরা মূলত নিজেদের নীতি-আদর্শকে রক্ষা করে জীবন বাঁচাবার জন্যই দেশত্যাগ করছেন। তাই তাঁদের দেশ ছেড়ে এভাবে চলে যাওয়াটা অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

যাই হোক, সংক্ষেপে এই আলোচনায় এটুকু অন্তত বোঝা যায় যে, যারা ধর্ম এবং বিশেষত ইসলাম ধর্মের সমালোচক; তারা এই খুনিদের প্রধান টার্গেট হয়েছে। এবং এই ধরনের খুনের পিছনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ধরনের রাজনীতির সংমিশ্রণও বিদ্যমান। আর এ কারণে মুক্তমনা লেখক-ব্লগারদের কাছে বাংলাদেশ এখন এক শ্বাপদের নাম

কিন্তু সেখানকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজ থেকে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজ একেবারে ভিন্ন। আমাদের আছে একটি সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, যার মধ্যে রয়েছে মানবতাবোধ ও ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি উদার দৃষ্টিভঙ্গি। আরব দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য তেমন কখনোই ছিল না। আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের পাশাপাশি আরও ছিল বামপন্থী ও সাম্যবাদী রাজনৈতিক আন্দোলন, যা একসময় যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। এই সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গিও আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির মধ্যে ভালোভাবেই দেখা যাবে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস ও সংস্কৃতির মধ্যে দেখা যাবে না।

তবে মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামি মৌলবাদের ক্ষেত্রে অন্য একটি জিনিস দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো ধর্মীয় সংগঠন মৌলবাদের চর্চা করলেও পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদবিরোধী উপাদানও তার মধ্যে দেখা যায় এবং সেই কারণে তারা জনপ্রিয়ও বটে। যেমন লেবাননে হিজবুল্লাহ অথবা গাজায় হামাস। তারা সশস্ত্রও বটে। ১৯৯৯ সালে ইউএনডিপি এক রিপোর্টে উল্লেখ করেছিল:

‘বিশ্বজোড়া ভোগবাদী সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক সমসত্ত্বতা গড়ে তোলার জেরে মৌলবাদী তৎপরতা বেড়েছে। স্থানীয় আঞ্চলিক সংস্কৃতিচর্চায় ফের উৎসাহ দেখা দিচ্ছে। রাজনৈতিক আন্দোলনে স্থানীয় সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় রক্ষার প্রশ্নটি গুরুত্ব পাচ্ছে। মৌলবাদী আন্দোলনগুলোর বিকাশের মধ্যে তা প্রতিফলিত হয়।’

মধ্যপ্রাচ্যে পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্বজাতীয় সংস্কৃতি ধরে রাখার ও আত্মপরিচয় তুলে ধরার প্রবণতার মধ্যে জাতীয়তাবাদী উপাদান আছে, যার সঙ্গে ইসলামকে এক করে দেখার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে কোনো মৌলবাদী সংগঠন, তা জামায়াত, হেফাজত, জেএমবি—যে-ই হোক, কারও কথায় বা কাজে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী উপাদান নেই। জাতীয়তাবাদী উপাদানও নেই। বরং এই ধরনের সব ধর্মীয় রাজনৈতিক দল ও সংগঠন বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাঙালি সংস্কৃতিকেই অস্বীকার করতে চায়। ঠিক এই কারণেই ধর্মীয় মৌলবাদী সংগঠনগুলো এই দেশে কোনো গণভিত্তি অর্জন করতে আগেও পারেনি, এখনো পারবে না।

ধর্মীয় মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদ খুবই বিপজ্জনক। তারা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি করতে পারে। তারা মানুষ খুন করেছে, হয়তো ভবিষ্যতে আরও করবে। তাদের অবশ্যই পুলিশ-প্রশাসন দ্বারা দমন করতে হবে। কিন্তু তাদের পরাজিত করার প্রধান অস্ত্র হলো মতাদর্শ ও সংস্কৃতি। যারা আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিই মানে না, তারা কী করে বিস্তার লাভ করবে?

আমাদের এই সংস্কৃতির ভিত্তি বা উৎস ধর্ম নয়, বরং লোকায়ত চিন্তা ও ভাবাদর্শ, যা প্রজন্ম–পরম্পরায় চলে আসছে। সেই চর্যাপদের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত। শুধু আধুনিক লিখিত সাহিত্যে নয়, পালা, পল্লিগান, যাত্রা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতির প্রকাশ ও বিস্তার আমরা দেখি, যার মধ্যে কিছু ধর্মীয় বিষয় ও কখনো কখনো রাজপুরুষদের কাহিনি থাকলেও (মহাকবি ও শ্রেষ্ঠ নাট্যকার শেক্‌সপিয়ারের নাটকেও রাজরাজড়ার ও ভূত-প্রেতের কাহিনি আছে) মর্মবস্তুর মধ্যে যা প্রধান ছিল, তা হলো মানুষের প্রতি ভ্রাতৃত্ববোধ, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও উদারপন্থী মতবাদ। ঐতিহাসিক সুজিত আচার্য ‘বাংলায় ইসলাম ধর্মের আদিপর্ব’ নামক রচনায় বলেছেন, এ দেশে ইসলাম ধর্ম বিস্তার লাভ করেছিল তরবারির জোরে নয়, বরং সুফি মতবাদী ধর্ম প্রচারকদের দ্বারা। তাঁদের মতবাদের সঙ্গে এই দেশের শোষিত নিম্নবর্ণের হিন্দুরা তাদের সহজিয়া মতবাদের অনেক সামঞ্জস্য খুঁজে পেয়েছিল। ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের অনেক আগেই যে বৌদ্ধধর্মের সহজিয়া মতবাদ ও বেদবিরোধী লোকায়ত দর্শন জনমনে গভীরভাবে স্থান করে নিয়েছিল, তার মানবিক দিক ছিল অনেক বেশি। সহজিয়া সাহিত্যে বৈদিক ধর্ম, পৌরাণিক পূজাপদ্ধতি, এমনকি বৌদ্ধধর্মের অনেক আচার-নিষ্ঠাকে কটাক্ষ করা হতো।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে হিন্দু পুনর্জাগরণবাদের প্রবাহ দেখা দিয়েছিল, যার প্রধান প্রবক্তা ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। অন্যদিকে প্রায় একই সময় নবাব আবদুল লতিফ প্রমুখের নেতৃত্বে মুসলিম জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ঘটে, যাঁরা জাতীয়তাবাদের উৎস খুঁজতেন দেশের বাইরে আরব, ইরান ও তুরস্কে। নবাব আবদুল লতিফ মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তিনি মোহামেডান সোসাইটি গঠন করেছিলেন, যেখানে ইংরেজি ভাষার চর্চা হতো, কিন্তু বাংলা ভাষা নিষিদ্ধ ছিল। তখন থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তথাকথিত অভিজাত মুসলমানরা ঘরে উর্দু বলত। পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলন সেই আভিজাত্য ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। জিন্নাহ ও মুসলিম লিগের নেতারা তথাকথিত অভিজাত মুসলমানদের জানতেন ও চিনতেন। সাধারণ মুসলমান জনগণের সঙ্গে পরিচয় ছিল না। তাই বাংলা ভাষাকে তাচ্ছিল্য করার এবং উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করার মতো ঔদ্ধত্য দেখাতে পেরেছিলেন, যার উপযুক্ত জবাব তিনি সঙ্গে সঙ্গেই পেয়েছিলেন। পাকিস্তানি শাসকেরাও নানাভাবে চেষ্টা করেছিলেন বাংলা ভাষা বিকৃত করার এবং বাঙালির সংস্কৃতি ধ্বংস করার। কিন্তু পারেননি। কারণ, এই সংস্কৃতির অভ্যন্তরীণ বল অনেক বেশি। বরং পাকিস্তানি ভাবাদর্শ ছিল বড়ই ঠুনকো, তাই তা টিকতে পারেনি।

আমাদের দেশে ধর্মীয় সংস্কারভিত্তিক সামাজিক আন্দোলন হয়েছিল ইংরেজ আমলেও। ওয়াহাবি আন্দোলন ও ফরায়েজি আন্দোলন ইতিহাসবিখ্যাত। এসব আন্দোলন ইসলাম ধর্মের সংস্কার দিয়ে শুরু হলেও তা ব্রিটিশ রাজবিরোধী ও জমিদারবিরোধী শ্রেণিসংগ্রাম ও জাতীয়তাবাদী সংগ্রামে পরিণত হয়েছিল। শহীদ বীর তিতুমীর মুসলমান কৃষককে ধর্মশিক্ষা দিতেন, আরবি-ফারসি শব্দে নাম রাখা ও ‘আকিকা’ করার কথা বলতেন। তিনি দাড়ি রাখার গুরুত্বও তুলে ধরেছিলেন। ফরায়েজি আন্দোলনের নেতা পীর মহসিন উদ্দিন দুদু মিয়া পোশাকপরিচ্ছদে হিন্দু থেকে মুসলমানদের স্বতন্ত্র হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি ধুতিকে হিন্দুর পোশাক বলে ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু ওয়াহাবি নেতা তিতুমীর অথবা ফরায়েজি আন্দোলন জনপ্রিয় হয়েছিল এসব কারণে নয়। তাদের জমিদারবিরোধী সংগ্রামেই হিন্দু-মুসলমাননির্বিশেষে সব কৃষক ও গরিব মানুষ যোগদান করেছিল।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, আমাদের সংস্কৃতিতে ধর্মীয় চেতনা কখনোই প্রাধান্য বিস্তার করেনি। বরং অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি—যা আমাদের লোকায়ত সংস্কৃতির উপাদান হিসেবে ছিল এবং এখনো আছে, তা খুবই শক্তিশালী। তাই আনিসুল হকের কথার প্রতিধ্বনি করে আবারও বলব, ‘বাংলাদেশের মানুষের পরাজয় নেই, কারণ তার আছে সংস্কৃতি।’ আলোচনার প্রারম্ভে প্রাসঙ্গিকভাবেই জানা প্রয়োজন ধর্মীয় মৌলবাদ কী? সকল ধর্মীয় মৌলবাদ হল বাস্তব বর্জিত, যুক্তিহীন, বৈজ্ঞানিক ভাবনা-চিন্তাহীন, সমাজতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, বিবর্তনের জ্ঞানহীন এক অসুস্থ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন মতবাদ। ধর্মীয় মৌলবাদীরা বর্তমানকালে জীবনধারণ করে থাকে, বর্তমানকালের বিজ্ঞান ও সভ্যতার সকল সুযোগ সুবিধাদি ভোগ করে; অথচ সহস্রাব্দকাল আগের কথিত ধর্মীয় সামাজিক আচারাদি যা বর্তমানকালে পুরোপুরি অচল, সেই অচল সমাজ ব্যবস্থাই চালু করতে চায়। সহস্রাব্দকাল আগের প্রাচীন রীতি-নীতি ধর্মবিশ্বাস যে কোন প্রক্রিয়ায় (খুন করে হলেও) সকল মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চায়। এইসব ধর্মীয় মৌলবাদীরা মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত আচার আচরণের স্বাধীনতা কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের কোনও মূল্য দিতে রাজি নয়। যতো গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন, যা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থে নেই, তার অস্তিত্বই এরা স্বীকার করে না। এদের মতে- ‘সবকিছুই ধর্মগ্রন্থে রয়েছে’। আর ধর্মগ্রন্থে যা নেই মানুষের জীবনে তার দরকারও নাই। মুসলিম ধর্মীয় মৌলবাদীদের উদ্দেশ্য বিশ্বব্যাপী খিলাফত শাসন প্রতিষ্ঠা করা।যেখানে শরিয়াহ আইনের অধীনে পুরো রাষ্ট্রকাঠামো চলবে। যা আধুনিক বিশ্বে গণতন্ত্র বলে পরিচিত রাষ্ট্রকাঠামোর ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত ও সাংঘর্ষিক।

বর্তমানে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল, ক্ষমতার বাইরে থাকা বিরোধী দল থেকে শুরু করে সংবাদ মিডিয়া, লেখক বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে অধিকাংশই অবিশ্বাসীদের সংস্রব এড়িয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকছেন। আর এই সুযোগটাই ইসলামি জঙ্গিগোষ্ঠী কাজে লাগাচ্ছে। জঙ্গিরা একের পর এক মুক্তচিন্তার লেখকদের প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে হত্যা করলেও তারা কেউ-ই কার্যকরী প্রতিবাদ বা বিক্ষোভ করছেন না, সরকারও সত্যিকারভাবে তাদের দমনের ব্যাপারে আন্তরিক নয়। ফলে জঙ্গিরা দিন দিন আরও সাহসী হয়ে উঠছে। অবস্থা এখন এমনই দাঁড়িয়েছে যে, মৌলবাদী জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যারাই মুখ খুলছেন তারাই ‘নাস্তিক’ উপাধি পাচ্ছেন। আর বাংলাদেশে ‘নাস্তিক’ উপাধি পাওয়াকে অধিকাংশ মানুষ ঘৃণার চোখে দেখেন। সমাজে মানুষের বড় একটি অংশ মনে করেন নাস্তিকদের হত্যা করা অন্যায় কিছু নয়।

  • Related Posts

    • January 16, 2026
    আমি মৌলবাদীদের ঘৃণা করি কারণ তারা দেশকে পিছিয়ে দিতে চায়, জীবন থেকে নাচ–গান মুছে ফেলতে চায়

    হ্যাঁ, আমি মৌলবাদীদের ঘৃণা করি। এই কথাটা ঘুরিয়ে বলার দরকার নেই। আমি ঘৃণা করি, কারণ তারা বাংলাদেশকে সামনে নয়, পেছনে হাঁটাতে চায়। তারা মানুষের হাসি, গান, নাচ, রং, প্রশ্ন—সবকিছুর শত্রু।তারা…

    • January 5, 2026
    ফ্যাসিবাদ একটি জাতীয়তাবাদী, একনায়কতান্ত্রিক এবং সামরিকবাদী আদর্শ, যা ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্রকে বেশি গুরুত্ব দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্যাসিবাদকে এক ধরনের অন্ধকার অধ্যায় হিসেবেই বিবেচনা করা হতো

    আধুনিক সমাজে ফ্যাসিবাদ : একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা ফ্যাসিবাদ একটি জটিল রাজনৈতিক দর্শন, যা একক ব্যক্তির চিন্তাধারার ফসল নয়। বরং এটি বিভিন্ন দার্শনিক, রাজনীতিবিদ এবং সমাজতাত্ত্বিকের ধারণার সংমিশ্রণ। ফ্যাসিবাদের মূল ধারণাগুলো…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    আমি মৌলবাদীদের ঘৃণা করি কারণ তারা দেশকে পিছিয়ে দিতে চায়, জীবন থেকে নাচ–গান মুছে ফেলতে চায়

    • January 16, 2026

    ফ্যাসিবাদ একটি জাতীয়তাবাদী, একনায়কতান্ত্রিক এবং সামরিকবাদী আদর্শ, যা ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্রকে বেশি গুরুত্ব দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্যাসিবাদকে এক ধরনের অন্ধকার অধ্যায় হিসেবেই বিবেচনা করা হতো

    • January 5, 2026

    বাংলাদেশ কি নীরবে মৌলবাদীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে?হেফাজত–জামায়াতের উত্থান এবং ব্লগার হত্যার রক্তাক্ত যোগসূত্র

    • December 23, 2025

    পুঁজিবাদ সম্প্রসারণে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা খুবই সহায়ক হয়েছিলো

    • December 23, 2025

    ধর্মীয় ভোট ব্যাংকের’ অসুস্থ রাজনীতির মাঠে বামেদের মৃত্যুই তাদের কাম্য

    • December 10, 2025

    ধর্মের অপব্যবহার ও ধর্মান্ধতার মাত্রা, গভীরতা ও বিস্তার দেখে মনে হচ্ছে যে ধর্মের আবির্ভাব হয়েছিল পৃথিবীর মানুষকে বিশৃঙ্খলা, অশান্তি ও গোঁড়ামি থেকে মুক্তি দিতে সেই হয়ে উঠেছে গোঁড়ামিপূর্ণ।

    • November 26, 2025