নারীর শিক্ষা ও পোশাক: মৌলবাদীরা আসলে কী ভয় পায়?
বাংলাদেশে কিছু মৌলবাদী গোষ্ঠী বারবার একই কথা বলে আসছে—নারীরা বেশি দূর পড়াশোনা করতে পারবে না, নারীদের অবশ্যই বোরকা পরতে হবে, নারীর জীবন নির্দিষ্ট সীমার বাইরে গেলে সমাজ নষ্ট হয়ে যাবে। এই দাবিগুলো কেবল মতামত নয়; এগুলো সরাসরি নারীর স্বাধীনতা, অধিকার এবং ভবিষ্যতের ওপর আঘাত।
এই অবস্থান প্রকাশ্যে ও সংগঠিতভাবে তুলে ধরে হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশ, দেওয়ানবাগী গোষ্ঠী, এবং হিজবুত তাওহীদ। তারা নারীর শিক্ষা ও পোশাককে নিয়ন্ত্রণ করার মধ্য দিয়ে আসলে সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর ওপর ক্ষমতা কায়েম করতে চায়।
প্রশ্ন হলো—তারা কেন নারীদের বেশি পড়াশোনা করতে দিতে চায় না?
কারণ শিক্ষিত নারী প্রশ্ন করে।
কারণ শিক্ষিত নারী যুক্তি বোঝে।
কারণ শিক্ষিত নারী অন্যায়ের সামনে মাথা নত করে না।
নারী যখন শিক্ষিত হয়, তখন সে শুধু চাকরি করে না; সে নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে শেখে। সে জানে কোনটা অধিকার, কোনটা নিপীড়ন। আর এই জ্ঞানই মৌলবাদীদের সবচেয়ে বড় শত্রু।
বোরকা বাধ্যতামূলক করার দাবি একই মানসিকতার অংশ। এখানে বিষয়টা পোশাক নয়, পছন্দের স্বাধীনতা। কোনো নারী যদি স্বেচ্ছায় বোরকা পরেন, সেটি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু যখন বলা হয় “নারীদের বোরকা পরতেই হবে”, তখন সেটা ধর্ম নয়—ক্ষমতার রাজনীতি।
মৌলবাদীরা নারীর শরীরকে নিয়ন্ত্রণের জায়গা হিসেবে দেখে। তারা ঠিক করে দিতে চায় নারী কী পড়বে, কী পরবে, কোথায় যাবে, কতদূর পড়বে। এই নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়েই তারা নিজেদের সামাজিক কর্তৃত্ব বজায় রাখে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো—এই দাবিগুলোকে ধর্মের ভাষায় পবিত্র করে তোলা হয়। বলা হয়, নারীর বেশি পড়াশোনা ‘অশ্লীলতা’ বাড়ায়। নারী ঘরের বাইরে গেলে সমাজ নষ্ট হয়। কিন্তু ইতিহাস বলে ঠিক উল্টো কথা। যেখানে নারীরা শিক্ষিত, সেখানে সমাজ বেশি মানবিক, বেশি ন্যায়ভিত্তিক, বেশি উন্নত।
বাংলাদেশের সংবিধান নারীর শিক্ষা ও সমান অধিকারের কথা বলে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নারীর স্বাধীনতাকে স্বীকার করে। সেই দেশে দাঁড়িয়ে নারীর শিক্ষার ওপর সীমা টানা মানে সংবিধান ও ইতিহাস—দুটোকেই অস্বীকার করা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে—যদি নারীর পড়াশোনা সত্যিই সমাজের জন্য ক্ষতিকর হতো, তাহলে কেন শিক্ষিত নারী চিকিৎসক, শিক্ষক, গবেষক, প্রশাসক হয়ে দেশ চালাচ্ছে? কেন নারীর শিক্ষা কমিয়ে দিলে কোনো দেশ উন্নত হয়নি, বরং পিছিয়ে গেছে?
এই কলাম কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। এটি জোর করে চাপিয়ে দেওয়া ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে। ধর্ম যদি ন্যায়, করুণা আর মর্যাদার কথা বলে, তাহলে নারীর শিক্ষা আর স্বাধীনতা তার বিরুদ্ধে যেতে পারে না।
নারীকে ঘরে বন্দি করে কোনো সভ্যতা টিকে না।
নারীর কণ্ঠ রোধ করে কোনো সমাজ নিরাপদ হয় না।
নারীর শিক্ষা বন্ধ করে কোনো ভবিষ্যৎ গড়া যায় না।
আজ যারা বলছে নারীরা বেশি দূর পড়তে পারবে না, তারা আসলে বলছে—নারীরা স্বাধীনভাবে ভাবতে পারবে না। আর সেই দাবির বিরুদ্ধে কথা বলা শুধু নারীদের দায়িত্ব নয়, পুরো সমাজের দায়িত্ব।
কারণ নারীর শিক্ষা মানে কেবল নারীর মুক্তি নয়—এটা একটি দেশের মুক্তি।
আমি মৌলবাদীদের ঘৃণা করি কারণ তারা দেশকে পিছিয়ে দিতে চায়, জীবন থেকে নাচ–গান মুছে ফেলতে চায়
হ্যাঁ, আমি মৌলবাদীদের ঘৃণা করি। এই কথাটা ঘুরিয়ে বলার দরকার নেই। আমি ঘৃণা করি, কারণ তারা বাংলাদেশকে সামনে নয়, পেছনে হাঁটাতে চায়। তারা মানুষের হাসি, গান, নাচ, রং, প্রশ্ন—সবকিছুর শত্রু।তারা…