এই প্রশ্নটা এখন আর তাত্ত্বিক না। এটা রক্তে লেখা প্রশ্ন। বাংলাদেশ কি দিনে দিনে মৌলবাদীদের দখলে চলে যাচ্ছে? উত্তর খুঁজতে হলে শুধু বক্তব্য বা মিছিল নয়, তাকাতে হবে সেই খুনগুলোর দিকে—যেগুলো হয়েছে কলম ধরার অপরাধে।
খোলাখুলি বলা দরকার। হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যে পরিবেশ তৈরি করেছে, সেই পরিবেশেই ব্লগার হত্যা সম্ভব হয়েছে। তারা নিজেরা সবাই হাতে চাপাতি ধরেনি, কিন্তু তারা সেই মানসিকতা তৈরি করেছে যেখানে হত্যা ন্যায্য হয়ে ওঠে।
২০১৩ থেকে ২০২৪—এই কয়েক বছরে একের পর এক মুক্তচিন্তার ব্লগার, লেখক, প্রকাশককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
তাদের অপরাধ কী ছিল?
লেখা। প্রশ্ন করা। যুক্তি দেওয়া। ধর্মীয় উগ্রতার বিরোধিতা করা।
অভিজিৎ রায়কে বইমেলায় কুপিয়ে হত্যা করা হলো।
তারপর একে একে খুন হলো আরও অনেক ব্লগার।
রাস্তায়, বাসায়, প্রকাশ্যে।
আর রাষ্ট্র?
বেশিরভাগ সময় নীরব।
বেশিরভাগ সময় ধীর।
বেশিরভাগ সময় আপসহীন মৌলবাদীদের সামনে অসহায়।
এই হত্যাগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। এগুলো একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক বার্তা। বার্তাটা খুব পরিষ্কার—“লিখলে মরবে।”
এই ভয়টাই মৌলবাদীদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
হেফাজত ইসলাম যখন প্রকাশ্যে বলে নারীরা বেশি পড়তে পারবে না, ভাস্কর্য ভাঙতে হবে, পাঠ্যবই বদলাতে হবে—তখন তারা কেবল দাবি তোলে না, তারা বলে দেয় কে কথা বলতে পারবে, আর কে পারবে না।
আর জামায়াতে ইসলামী বছরের পর বছর সেই চিন্তাকে সংগঠিত কাঠামোয় রূপ দিয়েছে। তারা জানে, কখন চুপ থাকতে হবে, কখন সামনে আসতে হবে।
এই দুই ধারার মিলনেই ব্লগার হত্যা সম্ভব হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় কী জানো?
এই হত্যার পর সমাজের একাংশ বলেছে—
“লিখত কেন?”
“ধর্মে আঘাত দিলে তো হবেই।”
এই কথাগুলোই খুনিদের নৈতিক লাইসেন্স দেয়।
কারণ মৌলবাদীরা সমাজ দখল করে শুধু অস্ত্র দিয়ে না।
তারা দখল করে যুক্তিকে অপরাধ বানিয়ে।
চিন্তাকে অপরাধ বানিয়ে।
লেখাকে অপরাধ বানিয়ে।
রাষ্ট্র যখন এই খুনগুলোর বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন মৌলবাদীরা বুঝে যায়—এই দেশে চাপাতির চেয়ে কলম দুর্বল। তখনই তারা আরও সাহস পায়। তখনই তারা আরও দূর যায়।
আজ প্রশ্নটা তাই শুধু হেফাজত বা জামায়াত নিয়ে না।
আজ প্রশ্নটা ব্লগার হত্যার বিচার নিয়ে।
মুক্তচিন্তার নিরাপত্তা নিয়ে।
আমরা কোন সমাজ চাই, সেই প্রশ্ন নিয়ে।
কারণ যে দেশে ব্লগার হত্যা হয়,
সেই দেশে সাংবাদিক নিরাপদ না।
সেই দেশে শিক্ষক নিরাপদ না।
সেই দেশে ছাত্র নিরাপদ না।
আজ ব্লগার, কাল যে কেউ।
এখনো সময় আছে।
কিন্তু সময় খুব কম।
মৌলবাদ থামে না আপসে।
মৌলবাদ থামে না নীরবতায়।
মৌলবাদ থামে কেবল স্পষ্ট অবস্থানে, বিচার নিশ্চিত করে, আর ভয়কে প্রত্যাখ্যান করে।
এই লেখা কোনো উসকানি না।
এই লেখা একটি সতর্ক ঘণ্টা।
প্রশ্নটা তাই শেষবারের মতো পরিষ্কার করে রাখি—
আমরা কি খুনের পর শোক করেই থেমে যাব?
নাকি বলব, এই দেশ কলমের, চাপাতির না?
কারণ এখন চুপ থাকা মানে নিরপেক্ষ থাকা না।
চুপ থাকা মানে খুনিদের জন্য জায়গা করে দেওয়া।
আমি মৌলবাদীদের ঘৃণা করি কারণ তারা দেশকে পিছিয়ে দিতে চায়, জীবন থেকে নাচ–গান মুছে ফেলতে চায়
হ্যাঁ, আমি মৌলবাদীদের ঘৃণা করি। এই কথাটা ঘুরিয়ে বলার দরকার নেই। আমি ঘৃণা করি, কারণ তারা বাংলাদেশকে সামনে নয়, পেছনে হাঁটাতে চায়। তারা মানুষের হাসি, গান, নাচ, রং, প্রশ্ন—সবকিছুর শত্রু।তারা…