ধর্মীয় উগ্রবাদ স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি

সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মের অপব্যবহার ও ধর্মান্ধতার মাত্রা, গভীরতা ও বিস্তার দেখে মনে হচ্ছে যে ধর্মের আবির্ভাব হয়েছিলো পৃথিবীর মানুষকে বিশৃঙ্খলা, অশান্তি গোঁড়ামি থেকে মুক্তি দিতে সেই হয়ে উঠেছে গোঁড়ামিপূর্ণ।

ধর্মীয় উগ্রবাদ এখন জাতিরাষ্ট্রের গন্ডি পেরিয়ে গোটা বিশ্বের শান্তি, সংহতি, প্রগতির, অগ্রগতির সামনে বিষাক্ত ফণা তুলে ধরছে।ধর্মীয় উগ্রবাদের বিষবাম্প আজ পুরো মানবজাতিকে ঠেলে দিচ্ছে অশান্তি বিশৃঙ্খলার দিকে। আধুনিক গনতান্ত্রিক বিশ্বে ধর্মকে রাজনীতিকরণ চলছে ব্যাপকভাবে।তার ফায়দা লুটাচ্ছে কিছু নামধারি লেবাসী সক্যুলার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।

দার্শনিক সেনেকা বলেছিলেন-Religion is regarded by the Common people as true, by the wise as false,and by the rulers as useful দার্শনিকের এই উক্তির মর্মকতা আমরা দক্ষিণ এশিয়ার সাধারণ মানুষ ও তরুণ সমাজের ওপর কিভাবে ধর্মভিত্তিক ও রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মীয় উগ্রবাদ সাম্পদায়িকতার বিষবাষ্প অনুপ্রবেশ করাচ্ছে তা খেয়াল করলেই বুঝতে পারি।দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ক্ষেত্রে বিষয়টা জিনগত কিনা জানা নেই।ধর্মভিত্তিক ও কথিত আধুনিক রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা সবাই পীর বা ঈশ্বরের প্রেরিত পুরুষ হয়ে উঠার চেষ্টা করেন।কিন্তু আদতে তাদের প্রধান উদ্দেশ্য রাজনৈতিক সুবিধা হাসিল করা।ধর্মভিত্তিক দলগুলোর নেতারা মূলত প্রান্তিক স্তরের মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন।কিন্তু তাদের প্রধান মোটিভ বা উদ্দেশ্য এইসব ধর্মভীরু মানুষকে দলে ভেড়ানো।অন্যদিকে প্রায়শই দেখা যায় একটু শিক্ষিত ও নিজেকে প্রগতিশীল দাবি করা সমাজের কিছু অংশ সাধারণ মানুষের সঙ্গে অন্তত দাম্ভিক আচারণ করে।ফলশ্রুতিতে এইসব প্রান্তিক স্তরের মানুষ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর ফাঁদে পড়ছে প্রতিনিয়ত।

এছাড়া বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও গবেষণা থেকে প্রতীয়মান যে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে তরুণ সমাজকে।তরুণ সমাজের ধর্মীয় উগ্রবাদে বশবতি হয়ে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা কঠিন হলেও এর জন্য মূলত পরিবারকেন্দ্রিক সামাজিককরণকে বহুলাংশে দায়ী করা যায়।কারণ সমাজবিজ্ঞানীগণ শিশু,কিশোর ও তরুণের সামাজিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতা নিয়ে গড়ে ওঠার জন্য পরিবারকে একটি মডেল প্লেস হিসাবে চিত্রিত করেন। কিন্তু আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশ ছাড়াও পাশ্চাত্যের মতো উন্নত দেশগুলোতে সামাজিকরণের ভিন্নতার জন্য তরুণ সমাজের মাঝে জঙ্গিবাদের ভয়ানক দর্শন প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে।

ফলস্বরূপ তা সমাজিক স্থিতিশীলকে বহুলাংশে বাধাগ্রস্ত করেছে।আমাদের মনে রাখা দরকার বৈচিত্র্য বা ডাইভার্সিটিই একটি আদর্শিক সমাজ কাঠামোর অন্যতম উপাদান। একটি স্থিতিশীল সমাজের পূর্বশর্ত হলো সেই সমাজে যেমন ভিন্ন ভিন্ন জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও গোষ্ঠীর মানুষ সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করবে।ঠিক তেমনি সেই সমাজে তারা সমান মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও পাবে।কিন্তু এক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখা জরুরি যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেন তারা সীমা পেরিয়ে না যায়। দার্শনিক বার্নাড শ তার লাঠি ঘুরিয়ে চলা এক বন্ধুকে বলেছিলেন তোমার লাঠির ঘুরিয়ে চলার স্বাধীনতা আমার নাকের ডগা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ।একইভাবে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ভিন্নমতের অধিকার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেন কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের সামিল না হয়, যা সমাজের সৌহার্দ্যপূর্ণ সহবস্থানকে প্রকম্পিত করে।নিজের ধর্মকে শ্রেষ্ঠ ধর্মমতকে চিরন্তন ও একমাত্র শাশ্বত ভাবার মধ্যেই রয়েছে ধর্মীয় উগ্রবাদের বীজ।ধর্মীয় উগ্রবাদের বসভর্তি হয়ে মানুষ ভুলে যায় ধর্মের মূল অর্থ ও উদ্দেশ্য। ধর্ম মানেই মনুষ্যত্ব যেমন আগুনের ধর্মই অগ্নিত্ব, পশুর ধর্মই পশুত্ব ।তেমনি মানুষের ধর্ম মানুষের পরিপূর্ণতা। এই পরিপূর্ণতাকে কোন এক অংশে বিশেষভাবে খন্ডিত করে তাকে ধর্মীয় লেবাস বা পোশাক পরিয়ে মনুষ্যত্বকে আঘাত করে। পরিণতিতে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে সমাজের স্বাভাবিক গতিশীলতা।

  • Related Posts

    • May 11, 2026
    মৌলবাদ’কে একটি গ্রামীণ, অনাধুনিক, পশ্চাৎপদ বিষয় হিসেবে দেখলে এর শেকড় সন্ধান পাওযা যাবে না, এর ব্যাপ্তি বোঝানো যাবে না

    পুঁজিবাদ সম্প্রসারণে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা খুবই সহায়ক হয়েছিলো। আর উপনিবেশগুলোতে রাজনৈতিক ক্ষমতা সম্প্রসারণে মিশনারীদের বিভিন্ন মাত্রার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিলো, ভূমিকা ছিলো স্থানীয় ধর্মীয় নেতা ও ক্ষমতাবানদেরও। আবার ঔপনিবেশিক শাসন বিরোধী ভূমিকাতেও…

    • March 31, 2026
    রাজনীতিহীনতার সুযোগে উগ্র, ধর্মান্ধ ও মৌলবাদী শক্তি আবারও সক্রিয় হচ্ছে

    রাজনীতিহীনতার সুযোগে উগ্র, ধর্মান্ধ ও মৌলবাদী শক্তি আবারও সক্রিয় হচ্ছে। এরপরও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির দাবিদার আওয়ামী লীগ সরকার চুপ করে আছে। কারণ, ধর্মীয় রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার সুবিধা এখন তারাও ভোগ করছে।…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    ধর্মীয় উগ্রবাদ স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি

    • May 20, 2026

    মৌলবাদ’কে একটি গ্রামীণ, অনাধুনিক, পশ্চাৎপদ বিষয় হিসেবে দেখলে এর শেকড় সন্ধান পাওযা যাবে না, এর ব্যাপ্তি বোঝানো যাবে না

    • May 11, 2026

    রাজনীতিহীনতার সুযোগে উগ্র, ধর্মান্ধ ও মৌলবাদী শক্তি আবারও সক্রিয় হচ্ছে

    • March 31, 2026

    ধর্মীয় মৌলবাদের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে- ধর্মের প্রাচীন মূল্যবোধ রাষ্ট্র এবং সমাজে প্রতিষ্ঠা করা।

    • March 1, 2026

    আমি মৌলবাদীদের ঘৃণা করি কারণ তারা দেশকে পিছিয়ে দিতে চায়, জীবন থেকে নাচ–গান মুছে ফেলতে চায়

    • January 16, 2026

    ফ্যাসিবাদ একটি জাতীয়তাবাদী, একনায়কতান্ত্রিক এবং সামরিকবাদী আদর্শ, যা ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্রকে বেশি গুরুত্ব দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্যাসিবাদকে এক ধরনের অন্ধকার অধ্যায় হিসেবেই বিবেচনা করা হতো

    • January 5, 2026