মৌলবাদীরা সমকামীদের কেন হত্যা করতে চায়? আর কেন মৌলভীবাজারের সমকামীরা আজ ভয়ংকরভাবে অনিরাপদ


মৌলবাদীদের কাছে সমকামী মানুষরা কোনো ব্যক্তি না, কোনো নাগরিক না—তারা কেবল একটি “অপরাধ”। এই অপরাধটি তারা নিজেরা বানিয়েছে, নিজেরা সংজ্ঞা দিয়েছে, আবার নিজেরাই তার শাস্তি ঠিক করেছে: মৃত্যু।
প্রশ্নটা তাই খুব সরল—মৌলবাদীরা সমকামীদের কেন হত্যা করতে চায়?
কারণ তারা ভিন্নতাকে ভয় পায়।
কারণ তারা মানুষের শরীর, প্রেম আর পরিচয়ের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চায়।
কারণ তারা এমন একটি সমাজ চায় যেখানে প্রশ্ন নেই, পছন্দ নেই, স্বাধীনতা নেই।
ধর্ম এখানে আসল কারণ নয়। ধর্মকে তারা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। বহু ধর্ম, বহু সংস্কৃতি যুগে যুগে ভিন্ন লিঙ্গপরিচয় আর যৌন পরিচয়ের মানুষকে স্বীকার করেছে। কিন্তু মৌলবাদীরা ধর্মকে একটি কঠোর, নির্দয় রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করেছে। যেখানে করুণা নেই, মানবিকতা নেই—আছে শুধু শাস্তি।
সমকামী মানুষদের তারা “পাপী”, “অশুদ্ধ”, “পশু” বলে চিহ্নিত করে। এই ভাষাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কাউকে মানুষ না ভাবতে পারলেই তাকে হত্যা করা সহজ হয়। যখন একজন মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা বন্ধ হয়ে যায়, তখন তার রক্ত ঝরলেও বিবেক নড়ে না।
এই বাস্তবতায় মৌলভীবাজারের সমকামীদের অবস্থা আরও ভয়াবহ।
মৌলভীবাজার এমন একটি এলাকা যেখানে সামাজিক নজরদারি প্রবল, ধর্মীয় চাপ তীব্র, আর ভিন্নতা প্রকাশ করার সুযোগ প্রায় নেই। এখানে সমকামী হওয়া মানে শুধু লুকিয়ে থাকা না—প্রতিদিন মৃত্যুভয়ের সঙ্গে বাঁচা।
পরিবার জানলে নির্যাতন।
সমাজ জানলে অপমান, বয়কট, মারধর।
ভুল মানুষের কানে গেলে—খুন।
আইনের কাছে তারা নিরাপদ নয়, কারণ অধিকাংশ সময় আইন নিজেই নীরব। প্রশাসন জানলেও “সংবেদনশীল বিষয়” বলে পাশ কাটিয়ে যায়। আর মৌলবাদীরা এই নীরবতাকেই লাইসেন্স হিসেবে নেয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—এই সহিংসতার পক্ষে অনেক সময় “নৈতিকতা” আর “ধর্মীয় মূল্যবোধ”-এর ভাষা ব্যবহার করা হয়। ফলে হত্যাকাণ্ডও এখানে অপরাধ না হয়ে “শুদ্ধিকরণ” হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু একটা কথা স্পষ্ট করে বলা দরকার:
সমকামী হওয়া কোনো অপরাধ নয়।
অপরাধ হলো মানুষকে তার পরিচয়ের জন্য হত্যা করা।
অপরাধ হলো ভয় তৈরি করে সমাজ শাসন করা।
মৌলভীবাজারের সমকামী মানুষরা আজ নিরাপত্তা চায়, করুণা নয়। তারা বাঁচতে চায়, লুকিয়ে নয়—মানুষ হিসেবে।
আর যারা এই সহিংসতার বিরুদ্ধে কথা বলে না, যারা নীরব থাকে, তারাও এই সহিংসতার অংশ হয়ে যায়। কারণ নীরবতা এখানে নিরপেক্ষতা না—নীরবতা মানে মৌলবাদীদের পক্ষে দাঁড়ানো।
এই লেখা কাউকে উসকানি দেওয়ার জন্য নয়। এই লেখা বেঁচে থাকার পক্ষে।
মানুষের পক্ষে।
ভিন্নতার পক্ষে।

  • Related Posts

    • January 16, 2026
    আমি মৌলবাদীদের ঘৃণা করি কারণ তারা দেশকে পিছিয়ে দিতে চায়, জীবন থেকে নাচ–গান মুছে ফেলতে চায়

    হ্যাঁ, আমি মৌলবাদীদের ঘৃণা করি। এই কথাটা ঘুরিয়ে বলার দরকার নেই। আমি ঘৃণা করি, কারণ তারা বাংলাদেশকে সামনে নয়, পেছনে হাঁটাতে চায়। তারা মানুষের হাসি, গান, নাচ, রং, প্রশ্ন—সবকিছুর শত্রু।তারা…

    • January 5, 2026
    ফ্যাসিবাদ একটি জাতীয়তাবাদী, একনায়কতান্ত্রিক এবং সামরিকবাদী আদর্শ, যা ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্রকে বেশি গুরুত্ব দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্যাসিবাদকে এক ধরনের অন্ধকার অধ্যায় হিসেবেই বিবেচনা করা হতো

    আধুনিক সমাজে ফ্যাসিবাদ : একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা ফ্যাসিবাদ একটি জটিল রাজনৈতিক দর্শন, যা একক ব্যক্তির চিন্তাধারার ফসল নয়। বরং এটি বিভিন্ন দার্শনিক, রাজনীতিবিদ এবং সমাজতাত্ত্বিকের ধারণার সংমিশ্রণ। ফ্যাসিবাদের মূল ধারণাগুলো…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    আমি মৌলবাদীদের ঘৃণা করি কারণ তারা দেশকে পিছিয়ে দিতে চায়, জীবন থেকে নাচ–গান মুছে ফেলতে চায়

    • January 16, 2026

    ফ্যাসিবাদ একটি জাতীয়তাবাদী, একনায়কতান্ত্রিক এবং সামরিকবাদী আদর্শ, যা ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্রকে বেশি গুরুত্ব দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্যাসিবাদকে এক ধরনের অন্ধকার অধ্যায় হিসেবেই বিবেচনা করা হতো

    • January 5, 2026

    বাংলাদেশ কি নীরবে মৌলবাদীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে?হেফাজত–জামায়াতের উত্থান এবং ব্লগার হত্যার রক্তাক্ত যোগসূত্র

    • December 23, 2025

    পুঁজিবাদ সম্প্রসারণে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা খুবই সহায়ক হয়েছিলো

    • December 23, 2025

    ধর্মীয় ভোট ব্যাংকের’ অসুস্থ রাজনীতির মাঠে বামেদের মৃত্যুই তাদের কাম্য

    • December 10, 2025

    ধর্মের অপব্যবহার ও ধর্মান্ধতার মাত্রা, গভীরতা ও বিস্তার দেখে মনে হচ্ছে যে ধর্মের আবির্ভাব হয়েছিল পৃথিবীর মানুষকে বিশৃঙ্খলা, অশান্তি ও গোঁড়ামি থেকে মুক্তি দিতে সেই হয়ে উঠেছে গোঁড়ামিপূর্ণ।

    • November 26, 2025