২০২২ সালের ২১ নভেম্বর, মৌলভীবাজার জেলার কাঠালতলী এলাকায় ঘটে যায় এক ভয়ঙ্কর ও হৃদয়বিদারক মানবিক বিপর্যয় — যার শিকারে পরিণত হন একজন প্রসূতি মা লাকী আক্তার ও তাঁর নবজাতক শিশু।
প্রসবব্যথা ওঠার পর, ওই প্রসূতি মাকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু তখনই এলাকায় সক্রিয় একটি মৌলবাদী গোষ্ঠী — যাদের আদর্শিক ভিত্তি হিজবুত তাওহীদ, দেওয়ানবাগি, হিজবুত তাহরির ও হেফাজতে ইসলাম —তাদের নেতা মোল্লা শাকিল আহমেদ ফতোয়া জারি করে:
> “পুরুষ ডাক্তার দ্বারা কোনো অবস্থাতেই ঐ নারীর চিকিৎসা করানো যাবে না।”
ঘটনার ভয়াবহতা এখানেই শেষ নয়।
ফতোয়ার প্রভাবে সেই নারীর স্বামী তার স্ত্রীকে হাসপাতালে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
এই চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন, অমানবিক সিদ্ধান্তের ফলে প্রসবজনিত জটিলতা দেখা দেয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে নারীটি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর নবজাতক শিশুটিও মারা যায় বিনা চিকিৎসায়।
—
এটা দুর্ঘটনা নয়, এটা হত্যাকাণ্ড।
একটি পরিবার ধ্বংস হয়ে গেল কেবলমাত্র ধর্মের অপব্যাখ্যা, অন্ধ ফতোবা, এবং নারীবিদ্বেষী চেতনার কারণে।
একজন মা এবং তার শিশুর জীবন কেড়ে নেওয়া হলো — অথচ এই সমাজ, এই রাষ্ট্র, এই প্রশাসন তাকিয়ে রইল চুপচাপ!
—
পুলিশের ভূমিকা:
এই ঘটনার পর আমি, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে, নিজ দায়িত্বে স্থানীয় থানায় গিয়ে মৌখিক ও লিখিত অভিযোগ দিই।
কিন্তু থানা থেকে জানানো হয়:
> ❝আমরা কিছু করতে পারবো না, কারণ স্বামী বাদী না হলে মামলা নেয়া যাবে না।❞
এরপর আমাকে থানার ভেতর থেকে জোরপূর্বক বের করে দেওয়া হয়।
প্রশ্ন উঠেছে —
যখন একজন নারীকে ইচ্ছাকৃতভাবে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করে হত্যা করা হয়, তখন কি শুধু স্বামী বাদী হলেই মামলা হবে?
রাষ্ট্র কি নারীর জীবন নিয়ে এইভাবে নিষ্ক্রিয় থাকবে?
—
এই ঘটনায় কে দায়ী?
এই প্রশ্নের উত্তর খুব পরিষ্কার:
1. মৌলবাদী ফতোয়াদাতা গোষ্ঠী — যারা ধর্মের নামে ফতোয়া দিয়ে নারীকে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করেছে।
2. স্বামী, যে অন্ধ আনুগত্যে স্ত্রীর জীবন বাঁচানোর বদলে ফতোয়ায় বিশ্বাস করে।
3. পুলিশ ও প্রশাসন, যারা একজন নাগরিকের অভিযোগ আমলে না নিয়ে চুপ করে থেকেছে এবং বাধা দিয়েছে।
—
আমি এই লেখার মাধ্যমে জাতির সামনে কিছু প্রশ্ন রাখতে চাই:
একটি নারীর জীবন কি এতটাই তুচ্ছ যে, শুধুমাত্র ধর্মীয় ব্যাখ্যার নামে তাকে চিকিৎসা বঞ্চিত করে মারা যেতে হয়?
নবজাতক একটি শিশু, যার জন্মই হয়নি ভালোভাবে — তাকেও কেন জীবন পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলো না?
এই রাষ্ট্র কেন মৌলবাদী চাপে চুপ থাকে?
কেন থানায় একজন নাগরিকের অভিযোগ গ্রহণযোগ্য হয় না?
—
আমার দাবিগুলো স্পষ্ট:
ঘটনার দ্রুত তদন্ত ও চার্জশিট দিতে হবে।
হিজবুত তাওহীদ, দেওয়ানবাগি, হিজবুত তাহরির ও হেফাজতের সংশ্লিষ্ট নেতাদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক ফতোয়া দিয়ে মৃত্যুর কারণ হওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার ও বিচারের আওতায় আনা হোক।
পুলিশের দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার জন্য বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
জাতীয়ভাবে ঘোষণা করতে হবে, চিকিৎসা বা নারীর মৌলিক অধিকার নিয়ে ধর্মীয় ফতোয়া জারি করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
—
এই লেখার উদ্দেশ্য:
আমি এই লেখা লিখছি কেবল একজন ব্লগার বা নাগরিক হিসেবে নয় — একজন মানুষ হিসেবে, একজন বিবেকবান মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়ানো নাগরিক হিসেবে।
যদি আজ আমরা চুপ থাকি, কাল হয়তো আমাদেরই মা, বোন, কন্যা, স্ত্রীর জীবন ঝুঁকিতে পড়বে।
ধর্ম কখনোই অমানবিক হতে পারে না।
কিন্তু যেসব গোষ্ঠী ধর্মকে হাতিয়ার বানিয়ে নারীকে চিকিৎসা, শিক্ষা ও জীবনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চায় — তারা এই সমাজের শত্রু।
—
সবাইকে বলছি:
আপনার অবস্থান নিন। প্রতিবাদ করুন।
এই লেখা শেয়ার করুন, আলোচনায় আনুন।
মৌলবাদ চুপচাপ থেকে থামানো যাবে না। রাষ্ট্রকে বাধ্য করতে হবে ব্যবস্থা নিতে।
—
#ফতোয়ায়_হত্যা
#নারীর_অধিকার
#ধর্মীয়_চরমপন্থা_বিরোধী
#মৌলভীবাজার_ট্র্যাজেডি
#জবাবদিহিতা_চাই
#হত্যা_কারীদের_গ্রেফতার_করুন
—
[শেষ কথা:]
প্রতিটি ফতোয়ায় যদি একটি করে প্রাণ যায় — তাহলে একসময় আমরা সকলেই হত্যার কাফেলায় দাঁড়িয়ে থাকবো।
আজ না জাগলে কাল খুব দেরি হয়ে যাবে।